জলিল-তাহেরের সৈনিক সংস্থা কি চুমু খাওয়ার জন্য ছিল ? : শাবান মাহমুদ ও রফিকুল ইসলাম রনি

সাক্ষাৎকার : মহিউদ্দিন আহমদ

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদের একসময়ের সক্রিয় কর্মী, কলামিস্ট ও আলোচিত রাজনৈতিক গ্রন্থ ‘জাসদের উত্থান-পতন : অস্থির সময়ের রাজনীতি’র লেখক মহিউদ্দিন আহমদ বলেছেন, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে জাসদ জড়িত ছিল না তবে এ জন্য দলটির হঠকারী রাজনীতি দায় এড়াতে পারে না। ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার প্রসঙ্গ তুলে এনে মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে পরিচালিত বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা বাহিনীটি কিসের জন্য? এটি কি বঙ্গবন্ধুকে চুমু খাওয়ার জন্য? প্রথমে এ সংস্থার কাজ শুরু করেছিলেন মেজর জলিল। যখন গ্রেফতার হলেন তখন মেজর জলিল বলেছিলেন, এখন থেকে যেন কর্মীরা কর্নেল তাহেরের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। রাজধানীর ধানমন্ডির বাসভবনে বাংলাদেশ প্রতিদিনের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে গতকাল জাসদের সেই সময়কার রাজনীতির বিভিন্ন প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন মহিউদ্দিন আহমদ। এক প্রশ্নের জবাবে মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ১৯৭২ সালের সংবিধান মেনে নিয়েই রাজনীতিতে জাসদের আত্মপ্রকাশ। ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে সংসদের বিরোধী দল হিসেবেও ভূমিকা রেখেছে জাসদ। তবে গণতন্ত্রের পথে হেঁটে হেঁটে একপর্যায়ে দলটির যাত্রা শুরু হয় উল্টোপথে। গণবাহিনী গঠনের মধ্য দিয়ে জাসদ রাজনীতির মূলধারা থেকে বিচ্যুত হয়ে আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতিতে সক্রিয় হয়। এর ফলে গণতান্ত্রিক ধারায় না থেকে উগ্রপন্থি রাজনৈতিক দলে পরিণত হয় জাসদ, যা ছিল একটি হঠকারী সিদ্ধান্ত। ১৯৭২ থেকে ’৭৫ পর্যন্ত জাসদের
ভূমিকা কি সংসদের বিরোধী দলের ভূমিকায় ছিল, নাকি বঙ্গবন্ধুর সরকারকে অস্থির করতেই রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ছিল-জানতে চাইলে মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘প্রথমত জাসদ রাজনৈতিক দল হিসেবে ভূমিকা রেখেছে এটি সত্য। পরে লক্ষ্যচ্যুত  হয় এটিও সত্য।’ বঙ্গবন্ধু সরকারের সাড়ে তিন বছরে সারা দেশে অস্থিরতা, একাধিক এমপিসহ আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের হত্যা আর বিভিন্ন স্থানে লুটপাটের জন্য জাসদ কতটা দায়ী-এসব প্রসঙ্গে মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘কোনোভাবেই জাসদ এ দায় এড়াতে পারে না। কারণ জাসদের কর্মী বাহিনীর হাতে শুধু আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা মরেছে তা নয়, জাসদেরও অনেক নেতা-কর্মী প্রতিপক্ষের রোষানলে প্রাণ হারিয়েছে। এটি জাসদের ভ্রান্ত রাজনীতিরই ফসল।’ তাহলে জাসদের সেদিনের রাজনীতি কি ভুল ছিল? জবাবে মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘তখনকার প্রেক্ষাপটে এ ভুলের বিশ্লেষণ কঠিন হলেও ৪০ বছর পর আজ তো অবলীলায় বলা চলে, জাসদের রাজনীতি ভুল ছিল। তখন সরকারের বিরোধিতার কারণেই অনেক বিতর্কিত ঘটনার জন্ম দিয়েছে জাসদ। দেশের তারুণ্যের বিশাল একটি অংশ অনেক স্বপ্ন দেখেছিল জাসদকে ঘিরে। সেই স্বপ্নের অপমৃত্যু ঘটতে সময় লাগেনি।’ জাসদ মূলত বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের স্লোগানে এ দেশের তরুণ সমাজের একটি অংশকে আকৃষ্ট করেছিল। কিন্তু দলটির সেই সময়ের কর্মকাণ্ড কি বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের ধারণাকেই বিতর্কিত করেনি? এমন প্রশ্নে মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমি তো আগেই বলেছি, যে স্বপ্ন নিয়ে জাসদের জন্ম হয়েছিল, জাসদ সেখানে সফল হতে পারেনি।’ যারা বঙ্গবন্ধুর চামড়া দিয়ে ডুগডুগি বাজাতে চেয়েছিল, আওয়ামী লীগের ফ্রন্টলাইনে তারা কীভাবে থাকেন-বিএনপি নেতা গয়েশ্বর রায়ের এমন প্রশ্নের প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়া হলে মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘এ কথা বলার অধিকার কেবল আওয়ামী লীগ নেতা কিংবা সমর্থকের থাকতে পারে। গয়েশ্বর রায়ের এমন কথা বলার অধিকার নেই। কারণ যে সময়ের কথা বলা হচ্ছে, সে সময় গয়েশ্বর রায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল শাখার জাসদ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এ ছাড়া জাতীয়তাবাদী যুবদল যখন গঠন করা হয়, তখন প্রায় সবাই জাসদের ছিল। জাসদ ছাত্রলীগের সভাপতি-সম্পাদকও যুবদলে যোগ দেন।’ জাসদের নেতারা আওয়ামী লীগে আছেন, মন্ত্রিসভায়ও আছেন এবং জোটেও ফ্রন্টলাইনে আছে-বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখেন। জবাবে মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘এটি আমি বলব, ১৪-দলীয় জোট ক্ষমতায়, আর বিরোধী দল হচ্ছে জাতীয় পার্টি। আমি বলতে চাই, আওয়ামী লীগ শত্রুর সংখ্যা কমিয়েছে। কারণ যারা বিরোধী হতে পারে তাদের জোটে নিয়েছে। কারণ বিএনপির সঙ্গে যারা জোটে আছে, তাদের মধ্যে একমাত্র জামায়াত ছাড়া হিসাবের মধ্যে কেউ নেই।’ ১৯৭২ থেকে ’৭৫ সাল পর্যন্ত সংসদে জাসদ বিরোধী দল ছিল। কিন্তু গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে তারা কতটা বিরোধী দলের ভূমিকায় ছিল? তারা কি গণবিরোধী হয়ে পড়েছিল? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বামপন্থি রাজনীতির অধিকাংশই মস্কোপন্থি দল। ষাটের দশকে এসে সশস্ত্র বিপ্লব ও সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়। এরপর দুই ভাগে ভাগ হয় বামপন্থি রাজনীতি। পাকিস্তান আমলে ১৯৪৭-৪৮ থেকেই কমিউনিস্ট রাজনীতি ব্যান (নিষিদ্ধ) ছিল। কাজেই তাদের একটি অবস্থান ছিল, আওয়ামী লীগের মধ্য থেকে উদ্দেশ্য হাসিল করা। পাকিস্তানে ’৭১ সালের পরও কমিউনিস্ট পার্টিকে রাজনীতি করতে দেওয়া হয়নি। এ ছাড়া মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ বেশ কিছু দেশে যেখানে সংসদীয় রাজনীতি, সেখানেও কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ’৭২ সালে বাংলাদেশে কমিউনিস্ট পার্টিকে রাজনীতি করার সুযোগ করে দেওয়া হয়। কারণ কমিউনিস্ট পার্টি ছিল আওয়ামী লীগের মিত্র। তারা ছয় দফা সমর্থন করেছে। মুক্তিযুদ্ধ করেছে।’ জাসদের গণবিরোধী অবস্থান সম্পর্কে তিনি বলেন, সশস্ত্র বিপ্লব এক জিনিস আর গণবিরোধী আরেক জিনিস। একটি দল যদি মনে করে, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচন করে ক্ষমতায় যেতে পারবে না, তারা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে পারবে না, তাহলে তারা সশস্ত্র বিপ্লবের পথ বেছে নিতে পারে, এমনটাই মনে করেছিল জাসদ। তবে সে সময় জাসদের তরুণরা এটি কীভাবে দেখেছে তা আলাদা জিনিস। আজ ৪০ বছর পর যদি ফিরে দেখি, তাহলে বলব, ওই সময়কার জাসদের অবস্থান ভুল ছিল। তবে সে সময় কেউ এটিকে ভুল বলেনি। জাসদ একপর্যায়ে গণবাহিনী গঠন করে। তারা যুক্তি দেখায়, বাকশাল গঠন করা হয়েছে। চতুর্থ সংশোধনী করা হলো জানুয়ারি মাসে। আর গণবাহিনী গঠন করা হলো জুলাই মাসে। সুতরাং জাসদের মধ্যে যে পালাবদল বলা হয় তা ’৭৪ সালের ১৭ মার্চের পর। ১৭ মার্চ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়ি ঘেরাও করার পর শুরু হয়। জাসদ নেতৃত্ব ধারণা করলেন, আমরা রাজনীতি করতে পারব না। সুযোগ নেই। আস্তে আস্তে নেতা-কর্মীদের আন্ডারগ্রাউন্ডে নিয়ে গেলেন তারা। গণবাহিনীর তো ঢাকায় কোনো কাজ ছিল না। কারণ ঢাকা শহরের গণবাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন কর্নেল তাহেরের ছোট ভাই আনোয়ার হোসেন। তিনি ছিলেন ঢাকা সিটি বাহিনীর কমান্ডার। কমান্ডার হিসেবে তিনি ছিলেন খুবই অযোগ্য। কারণ ঢাকা শহরে আমরা চুয়াত্তরের মাঝামাঝি থেকে অ্যাকশন দেখি দুটি। একটি হলো ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসবেন। একটা বিশেষ অনুষ্ঠান। এ অনুষ্ঠানের জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি চলছিল। রাষ্ট্রপতি আসবেন-গণবাহিনী ভাবল এটা তো মেনে নেওয়া যায় না। ১৪ আগস্ট গণবাহিনী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বেলা ১১টা থেকে ১টার মধ্যে তিনটি বোমা ফাটাল। এ বোমার সরবরাহ করেছিলেন তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ও গণবাহিনী সিটির কমান্ডার আনোয়ার হোসেন। যিনি বর্তমান সরকারের আমলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ছিলেন। ওই দিন লাইব্রেরি, কলাভবনের মাঝামাঝিতে কার্জন হলের সামনে টাইমবোমা হামলা করা হলো। তখন জাসদ এক ধরনের বোমা বানাত। এর নাম ছিল ‘নিখিল’ বোমা। গরিব পরিবার থেকে আসা এই মেধাবী ছাত্র বুয়েটের লেকচারার ছিলেন। ড. আনোয়ার সাহেব কেমিস্ট্রি ভালো বোঝেন। তিনি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার। তার চ্যান্সেলর (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান) যাতে নির্বিগ্নে ক্যাম্পাসে আসতে না পারেন, সে জন্য বোমা ফাটালেন। গণবাহিনীর ঢাকায় আরেকটি অ্যাকশন ১৯৭৫ সালের ২৬ নভেম্বরে। সে সময় ভারতীয় হাইকমিশনারকে জিম্মি করে তারা। উদ্দেশ্য ছিল কর্নেল তাহেরকে মুক্তি দিতে বাধ্য করা।’ বঙ্গবন্ধু হত্যার পথ সৃষ্টি করেছিল জাসদ-এটি আওয়ামী লীগের অভিযোগ। আপনি কী মনে করেন? এ প্রশ্নের উত্তরে মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘জাসদই যে হত্যাকাণ্ডের পথ সৃষ্টি করেছে এ অভিযোগ একপেশে। তবে জাসদের একটি ভূমিকা ছিল। জাসদের ভূমিকার কারণে আওয়ামী লীগ জনগণ থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা কমে যায় নিজেদের কারণে। সরকার যদি ভুল করে, বিরোধীরা তো সুযোগ নেবেই। জাসদের তৈরি হওয়ার কথাই ছিল না। ’৭০ সাল থেকেই ছাত্রলীগের বিভক্তি। ছাত্রলীগের মধ্যে পরস্পরবিরোধী দুটি ভূমিকা আছে। জাসদ সমাজতান্ত্রিক দলের কথা বললেও অন্য বামপন্থি দলগুলো জাসদকে সমর্থন করত না। এর অন্যতম কারণ ছিল, দীর্ঘদিন ধরে সমাজতন্ত্রের কথা বললেও তারা জনসভায় লোকজন পেত না। জাসদের সঙ্গে যে তরুণরা ছিল, তারা সবাই ছিল মুক্তিযোদ্ধা। ফলে খুব দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে জাসদ। ১৫ আগস্ট দুটি বিষয়। একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন, আরেকটি নারকীয় হত্যাকাণ্ড। হত্যাকাণ্ডের কারণে রাজনৈতিক পরিবর্তনটা কলঙ্কিত হয়েছে। রাজনৈতিক পরিবর্তনটা জাসদ চেয়েছে, আওয়ামী লীগের অনেক নেতাও চেয়েছিলেন। দলীয়ভাবে জাসদ এখনো ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল এটা আমি পাইনি। কেউ যদি ব্লেম (অভিযোগ) দিয়ে চরিত্র হনন করতে চায়, তাহলে ভিন্ন কথা। দলের মূল নেতা সিরাজুল আলম খান। কয়েক মাস আগে থেকেই তিনি নেই। ফিরেছেন অক্টোবরে। রব-শাজাহান সিরাজ, জলিল ছিলেন জেলে। ইনু, আম্বিয়া তখন ছিলেন পেছনে। হাসানুল হক ইনু তখন কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা ছিলেন না। গণবাহিনীতে ছিলেন। গণবাহিনীর কমান্ডার করা হয়েছিল কর্নেল তাহেরকে। ১৫ আগস্টের পর কমান্ডার কর্নেল তাহের, ডেপুটি কমান্ডার হাসানুল হক ইনু এবং সিটি কমান্ডার আনোয়ার হোসেন রেডিওতে গিয়েছিলেন। সেখানে গিয়ে মোশতাককে মার্শাল ল দেওয়ার প্রস্তাব দেন কর্নেল তাহের। বাকশালকে বাদ দিয়ে জাতীয় সরকার গঠন করার প্রস্তাবও ছিল তার। খন্দকার মোশতাক ১৫ আগস্ট মার্শাল ল জারি করেননি। জারি করেছেন ২০ আগস্ট। সেই মার্শাল ল জারি করে সংসদ বিলুপ্ত করেননি। সংসদ বাতিল করেছিলেন খালেদ মোশাররফ হোসেন। কাজেই তাহের, ইনু, আনোয়ার ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর কেন রেডিওতে গেলেন, এর জবাব তাদের দিতে হবে। এসব কারণে যদি আওয়ামী লীগের শেখ সেলিম সাহেব অভিযোগ করে থাকেন, তাহলে করতে পারেন। ধানমন্ডির রোডে বঙ্গবন্ধুর লাশ ৩২ ঘণ্টা পড়ে ছিল। তিনি নিহত হন ৫টা ৪০ মিনিটে। আর তাকে টুঙ্গিপাড়ায় নিয়ে যাওয়া হয় পরদিন দুপুর আড়াইটায়। বঙ্গবন্ধু যাদের বীরউত্তম, বীরপ্রতীক বানালেন, তারা কেউ আসেননি। সফিউল্লাহ, খালেদ মোশাররফ, তাহের আসেননি। কে এসেছিলেন? যখন বঙ্গবন্ধু একের পর এক সবাইকে ফোন করে সাড়া পাচ্ছেন না, তখন তার প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা কর্নেল জামিলকে ফোন করেছিলেন। ওই দিন তার পদোন্নতি নিয়ে ব্রিগেডিয়ার হয়ে ডিজিএফআইর চিফ হওয়ার কথা ছিল। ইউনিফর্ম পরার সময় পাননি। নিজেই গাড়ি চালিয়ে চলে আসেন। কিন্তু তাকে রাস্তায় হত্যা করা হয়েছে। সুতরাং বঙ্গবন্ধুকে নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্বে যারা ছিলেন, তাদের মধ্যে কেবল কর্নেল জামিলই জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছেন। অন্যরা এগিয়ে আসেননি। আজকে মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে কথা হয়। কর্নেল জামিল ছিলেন পাকিস্তান-প্রত্যাগত কর্মকর্তা। ওই সময় কোনো বীরপ্রতীক, বীরউত্তম উঁকিও দেয়নি। আওয়ামী লীগের একটি নেতাও ৩২ নম্বরে আসেননি।’ আপনি তো সিরাজুল আলম খান দাদা ভাইয়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠজন। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারে জাসদের অংশীদার হওয়ার বিষয়টি কি সিরাজুল আলম খান সমর্থন করেন বলে মনে করেন? জানতে চাওয়া হলে মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আসলে আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বে জাসদকেই তিনি সমর্থন করতেন। এখন আর কারও প্রতি তার আগ্রহ আছে বলে আমার মনে হয় না।’ চলমান এসব বিতর্কে কি আওয়ামী লীগ-জাসদের মধ্যকার সম্পর্কে দূরত্ব বাড়বে? জবাবে মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘এই জোটটা, এর যদি আদর্শ থেকে থাকে, তাহলে টিকবে। আর যদি সুবিধার জন্য হয়, তাহলে যে কোনো সময়ে ভেঙে যেতে পারে।’ হঠাৎ জাসদ নিয়ে এ ধরনের বিতর্ক কোনো ষড়যন্ত্র কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এসবের সঙ্গে ষড়যন্ত্র দেখি না। বিতর্ক তো ৪০ বছর পরও হতে পারে। আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাসদ জোটে আছে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় থেকে। আবার ২০০৮ সালের আগে জোট করেছে। কার্যকর আছে। জোটের ভাঙন তারাই ধরানোর চেষ্টা করবে, যারা মনে করে, জাসদ জোটে থাকলে আওয়ামী লীগ শক্তিশালী হবে। জাসদের কর্মী আছে। আওয়ামী লীগ যদি মনে করে, জাসদ আমাদের জন্য লাইয়াবিলিটি, এখন না থাকলে সমস্যা নেই, তাহলে তাদের মধ্যে থেকে উসকানি থাকতে পারে। কোনটা তা বলা মুশকিল। নিজেদের গরজে যদি এই জোটটা হয়ে থাকে তাহলে জোট টিকবে। আর যদি সুবিধার উৎস হয়, তাদের বাদ দিলেও সুবিধার সমস্যা নেই, তাহলে ভাঙবে। যখন জোট করবেন, তখন জোটের সঙ্গে অনেক কিছুই শেয়ার করতে হবে। এমনকি মন্ত্রিসভায়ও তা হতে পারে।’ সার্বিক ঘটনায় জাসদের কি জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত? প্রতিক্রিয়ায় মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘জাসদের রাজনীতি হঠকারিতা। অনেক কিছুই তাড়াহুড়ো করেছে। অনেকটা কিলিয়ে কাঁঠাল পাকানোর মতো। সব ঘটনা যদি মেলান, বঙ্গবন্ধু হত্যায় জাসদ বেনিফেশিয়ারি হতে পারেনি। অন্য একটি পক্ষ ক্ষমতা নিয়েছে। চলে গেছে সেনানিবাসে। জাসদের লাভ হয়নি। যেটা বলা হয়ে থাকে, জাসদের রাজনৈতিক গঠনে আওয়ামী লীগের স্বেচ্ছাচারিতাও দায়ী। আমরা বাঙালিরা কেন জাতির জনকের সঙ্গে এক হলাম। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সঙ্গে কেন গেলাম না? আমাদের ওপর শাসন-শোষণ চালানো হয়েছে। আওয়ামী লীগের অনেক অগণতান্ত্রিক আচরণ একটা একটা করে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। জাসদ রাজনৈতিক দল নয়, বাহাত্তর-পরবর্তী জনগণের আকাক্সক্ষার এক ধরনের প্রবণতা। মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফিরে আসা লাখ লাখ মানুষের আকাক্সক্ষা। কিন্তু সেই আকাক্সক্ষা পূরণে জাসদ সফল হতে পারেনি।’ বঙ্গবন্ধু হত্যায় জড়িতদের চিহ্নিত করার দাবি উঠেছে তদন্ত কমিশন গঠনের। আপনি কী মনে করেন? এ প্রশ্নে মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘অনেক দিন ধরে বলা হচ্ছিল, এ জন্য একটি নিরপেক্ষ-নির্মোহ তদন্ত কমিশন গঠন হতেই পারে। তাহলে তরুণ প্রজন্ম সঠিক ইতিহাসটি জানতে পারবে।’
-

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন