মুক্তিযুদ্ধের সময় শেখ সেলিম ছিলেন একজন শরণার্থী; সফিউল্লাহ একজন ‘জ্যান্ত মিথ্যাবাদী






মুখোমুখি দু’জন। 
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম ও সাবেক সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল (অব.) কে এম সফিউল্লাহ। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ও বঙ্গবন্ধুর হত্যার ঘটনায় শেখ ফজলুল করিম সেলিমের ভূমিকার সমালোচনা করেছেন কে এম সফিউল্লাহ। শেখ সেলিমের অভিযোগ, বঙ্গবন্ধু আক্রান্ত হওয়ার সময় তৎকালীন সেনাপ্রধান সফিউল্লাহর সহায়তা চেয়েছিলেন; কিন্তু তিনি কোন পদক্ষেপ নেননি। অন্যদিকে পঁচাত্তরের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার সময় শেখ সেলিম মার্কিন দূতাবাসে আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং তার সঙ্গে খোন্দকার মোশতাকের আঁতাত ছিল বলে অভিযোগ তুলেন কে এম সফিউল্লাহ। সম্প্রতি বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড নিয়ে তারা একে অপরকে
দোষারোপ করেন। এ ব্যাপারে গতকাল মানবজমিনের সঙ্গে আলাপকালে কে এম সফিউল্লাহ বলেন, অনেক বিতর্ক হয়েছে, আমি আর এতে অংশগ্রহণ করতে চাই না। এটা অনেক দূর গড়িয়েছে। আর এতে অসম্মানিত হচ্ছেন বঙ্গবন্ধু। আমি এ অসম্মানের মধ্যে সম্পৃক্ত হতে চাই না। বঙ্গবন্ধু হত্যার ৪০ বছর পর নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টির কারণ জানতে চাইলে শেখ সেলিমকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ইতিহাস সবাই জানে। নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টির কারণ হচ্ছে মন্ত্রিত্ব। আসল কারণ এটাই যখন তিনি দেখছেন অন্য দলের লোক মন্ত্রী হয়ে যাচ্ছেন তিনি মন্ত্রিত্ব পাচ্ছেন না- এটাই তার ক্ষোভ। 
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে শেখ সেলিমের ভূমিকার সমালোচনা করেন এস ফোর্সের অধিনায়ক। বলেন, তিনি (শেখ সেলিম) যে এত কথা বলছেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় তার ভূমিকাটা কী ছিল? তিনি ছিলেন একজন শরণার্থী। শরণার্থী হিসেবে যে যতটুকু করেছে তার আছে ততটুকুই। 
দেশে ফিরে শুধু ওপরে উঠছেন তিনি, শুধু পারিবারিক সূত্র ধরে। বাট হি হিজ নট ক্যাপাবল অব গোয়িং দেয়ার। তার যে বড় ভাই শেখ মণি, সে যুদ্ধকালীন সময় থেকেই প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিল। 
এভাবে ব্যক্তিস্বার্থের জন্য ইতিহাস বদলে দেয়ার অপচেষ্টা চলছে মন্তব্য করে মুক্তিযুদ্ধের সময় নিজের সাহসী ভূমিকার কথাও স্মরণ করেন সফিউল্লাহ। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করেছি সম্মুখযুদ্ধে। শুধু সম্মুখযুদ্ধে না, হাতাহাতিও করেছি। 
তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, কজন মানুষ হাতাহাতি যুদ্ধ করেছে? আল্লাহ তায়ালা সহায় ছিলেন বলেই শত্রুর দুটি গুলি আমার কোমরে ঝোলানো পিস্তলে এসে লাগে। আর এর প্রমাণ আছে কুমিল্লার ক্যান্টনমেন্টের মিউজিয়ামে। সেখানে আমার পিস্তলটা রাখা আছে। ওই পিস্তলের মধ্যে গুলি লেগেছিল। 
আমাকে লক্ষ্য করে ওই গুলি করা হয়েছিল। মিডিয়ার মাধ্যমে এসব প্রচারে আগ্রহী না বলেও জানান তিনি। পঁচাত্তরের ১৫ই আগস্ট শেখ সেলিমের ভূমিকা তুলে ধরতে একটি জাতীয় দৈনিককে উদ্ধৃত করে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের এ সদস্য বলেন, এই যে শেখ সেলিমকে নিয়ে আমি একটা কথা বলেছি ২০০৫ সালে ‘প্রথম আলোতে’ লেখা হয়েছে। শেখ সেলিমকে ১৫ই আগস্ট আমেরিকান এম্বেসিতে সাহায্যের জন্য যেতে দেখা গেছে। আমেরিকান এম্বেসি বঙ্গবন্ধুর জন্য এতই নিরাপদ ছিল? সেই আমেরিকান এম্বেসিতে সে গেছে সাহায্যের জন্য। তারাই তো সবকিছুর মূলে ছিল। এখন যদি বলি সে তাদের হয়ে কাজ করছে। এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, আমি মনে করি এটাই হয়েছে। ওই দিন সকালে হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালে যেটা এখন রূপসী বাংলা। সেদিন সকালে তৎকালীন আমেরিকান অ্যাম্বাসেডর ওই হোটেল থেকে বেরিয়ে বাসার দিকে গেছেন। সে রাত কাটাইছে ওখানে।
অপরদিকে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেছেন, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট ও তার পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ ইতিহাসের অংশ। সেই ইতিহাসের সত্যপাঠ আমি তুলে ধরেছি। এতে অনেকেরই এখন গাত্রদাহ শুরু হয়েছে। কিন্তু গাত্রদাহ হলেও কিছুই করার নেই। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য খুঁজে বের করতে হবে। দেশবাসী ও নতুন প্রজন্মের সামনে সত্য ইতিহাস তুলে ধরতে হবে। আর ইতিহাসের সত্য কথাটা আমি বলবোই। মানবজমিনের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন তিনি। শেখ সেলিম জানিয়েছেন, ১৯৭৫ সালের ঘটনাবহুল ৩রা নভেম্বর থেকে ৭ই নভেম্বর পর্যন্ত ঘটনাপ্রবাহও সময়মতো জাতির সামনে তুলে ধরবেন তিনি। এছাড়া, জাসদকে নিয়ে তার দেয়া বক্তব্য ১৪ দলের ঐক্য প্রক্রিয়ায় কোনরকম প্রভাব পড়বে না দাবি করে শেখ  সেলিম বলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপটের সঙ্গে ১৪ দলীয় জোটের কোন সম্পর্ক নেই। এটি জোটের রাজনীতিতে কোন প্রভাব পড়বে না। একটি প্রশিক্ষিত বাহিনী হয়েও বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড ও পরবর্তী সময়ে তখনকার রক্ষীবাহিনীর ভূমিকার বিষয়ে তিনি বলেন, রক্ষীবাহিনী কেন এগিয়ে আসলো না সেটি একান্তই রক্ষীবাহিনীর বিষয় ছিল। আর খন্দকার মোশ্‌তাকের মন্ত্রিসভায় আওয়ামী লীগ নেতাদের যারা গিয়েছে, তারা গিয়েছে। সবাই তো আর যায়নি। এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না। যারা গিয়েছিল, কেন গিয়েছিল তারাই ভাল বলতে পারবে।
‘জাসদই বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল’ এমন মন্তব্যসহ বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর তখনকার সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল কে এম  সফিউল্লাহর ভূমিকার কঠোর সমালোচনা, মর্মান্তিক এই হত্যাকাণ্ডের পর সেনাপ্রধান ও পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, কর্নেল তাহের, ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের ভূমিকার বিষয়টি উল্লেখ করে সমপ্রতি বিভিন্ন সভা-সমাবেশে কঠোর ভাষায় বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগ নেতা শেখ ফজলুল করিম সেলিম। তার এই বক্তব্যে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে হঠাৎই উত্তাপ ছড়ায়। আলোচনার ঝড় তুলে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাসদের শীর্ষ নেতারা বিভিন্ন বক্তব্যের মাধ্যমে বাহাসে লিপ্ত হন। এ নিয়ে বিতর্ক চলছে এখনও। 
নিজের বক্তব্যে অনড় রয়েছেন উল্লেখ করে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী এই নেতা বলেন, আমার বক্তব্যের পর জাসদ, সফিউল্লাহসহ অনেকেই অনেক কথা বলছেন। তাদের গাত্রদাহ শুরু হয়েছে। নিজেদের বাঁচানোর জন্য মিথ্যাচারের আশ্রয় নিচ্ছেন। কিন্তু শাক দিয়ে মাছ ঢাকা যায় না। আমি যা বলেছি তা ইতিহাসের সত্য ঘটনা। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পরবর্তী পরিস্থিতি আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। তখন কার কি ভূমিকা সেটিও প্রত্যক্ষ করেছি। দীর্ঘ দিন এই ইতিহাস মুছে ফেলার জন্য অনেক চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু ইতিহাসকে কখনও মুছে ফেলা যায় না। একদিন না একদিন তা প্রকাশ হবেই। 
সাবেক সেনাপ্রধান কে এম সফিউল্লাহর সমালোচনা করে তিনি বলেন, সফিউল্লাহ একজন ‘জ্যান্ত মিথ্যাবাদী’। 
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড নিয়ে তিনি বিভিন্ন সময়ে নানা বক্তব্য দিয়েছেন। ইতিহাসের সত্য বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে বলেই তিনি মিথ্যাচারের আশ্রয় নিচ্ছেন। একজন সেনাপ্রধান হয়েও ১৫ই আগস্ট তিনি বঙ্গবন্ধুকে রক্ষা করতে পারেননি। এটি তার চরম ব্যর্থতাই শুধু নয়, শাস্তিযোগ্য, আমর্জনীয় অপরাধ। শুধু তাই নয়, বছরের পর বছর এ নিয়ে তিনি নানা বক্তব্য দিয়েও বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন। যার ভেতরে ন্যূনতম দায়িত্ববোধ, অনুশোচনা আছে তিনি এভাবে মিথ্যাচার করতে পারেন না। তিনি হয়তো বাঁচার চেষ্টা করছেন। কিন্তু বাঁচতে পারবেন না। ইতিহাস ও নতুন প্রজন্ম তার বিচার ঠিকই করবে। 
শেখ সেলিম বলেন, তিনি (কে এম সফিউল্লাহ) বলেছেন, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পরেই আমি না-কি আমেরিকান অ্যাম্বাসিতে গিয়েছিলাম। কত বড় মিথ্যাচার! আমি কেন সেদিন আমেরিকার অ্যাম্বাসিতে যাবো? ঘটনার পরে আমার ভাইসহ অন্যদের লাশ হাসপাতালে আমি নিয়ে গিয়েছিলাম না-কি উনি গিয়েছিলেন? মিথ্যাচারের একটা সীমা থাকা উচিত। তিনি বলেন, আমি আবারও বলছি বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড কোন সেনা অভ্যুত্থান ছিল না। কিছু বিপথগামী সেনা কর্মকর্তা এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিল। মাত্র ১শ’ ৫০ জনের মতো সেনা কর্মকর্তা ও সৈনিক ছিল। ১৫ জন সেনা কর্মকর্তার পাশাপাশি ৫ জন ছিল অবসরপ্রাপ্ত। কিন্তু প্রায় দেড় লাখের মতো একটি সুসজ্জিত প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনী নিয়ে মাত্র দেড়শ’ জনকে মোকাবিলা ও বঙ্গবন্ধুকে রক্ষা করার জন্য সফিউল্লাহ কিছুই করতে পারলেন না, এটা অবিশ্বাস্য! একদিকে সেনাপ্রধান হয়েও বঙ্গবন্ধুকে তিনি রক্ষা করতে পারেননি, তাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেননি। অন্যদিকে হত্যা মামলায় তিনি আদালতে গিয়ে সাক্ষ্য দিলেন। যে নিজেই বড় অপরাধী সে নিজেই আদালতে সাক্ষ্য দেয় কিভাবে? 
আওয়ামী লীগের সাবেক এই মন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধুকে রক্ষা করতে না পারার ব্যর্থতা ও পরবর্তীতে তার ভূমিকা কি ছিল এ বিষয়ে খোঁজ নেয়া দরকার। আদালতও বলেছেন, বঙ্গবন্ধুকে রক্ষা করতে না পারার অপরাধে সফিউল্লাহর বিচার হওয়া উচিত। 
তিনি বলেন, শেখ ফজলুল হক মণি মারা যাওয়ার দেড় থেকে দুই ঘণ্টা পর বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়। কয়েক ঘণ্টা তার লাশ ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়ির সিঁড়িতে পড়েছিল। এই কয়েক ঘণ্টায় সফিউল্লাহ যাননি। তিনি খুনিদের সঙ্গে রেডিও স্টেশনে গেলেন। একজন রাষ্ট্রপ্রধানের লাশ বাড়ির সিঁড়িতে পড়ে রয়েছে। অথচ সেনাপ্রধান তা দেখতেও যাননি। কেন তিনি এরকম করলেন এ বিষয়েও খোঁজ নেয়া দরকার। শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, খুনিরা খুন করে আবার ক্যান্টনমেন্টে ফিরে যায় কি করে? পৃথিবীর ইতিহাসে এরকম নজির কি আছে? 
অথচ তারা (সেনাবাহিনী) সংখ্যায় ছিল খুবই অল্প। এদেরকে মোকাবিলা করা সেনাবাহিনীর পক্ষে কোন ব্যাপারই ছিল না। কিন্তু সফিউল্লাহসহ কেউ তাদের আটকায়নি, গ্রেপ্তারতো দূরে থাক। জিয়াউর রহমান, খালেদ মোশাররফও কিছু করেননি। নির্বিঘ্নে তাদের ক্যান্টনমেন্টে ঢুকতে দেয়া হলো। সফিউল্লাহ মোশ্‌তাক সরকারের আনুগত্য স্বীকার করলো। কর্নেল তাহের মেজর ডালিমের সঙ্গে পরামর্শ করলো। এমনকি সফিউল্লাহকে দেশের বাইরে অ্যাম্বাসিতেও নিয়োগ করা হলো। তখন এদের সবার ভূমিকা ছিল রহস্যজনক। কেন তাদের আচরণ রহস্যময় ছিল, সে সময়ে কার কি ভূমিকা ছিল তা জানতে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করা উচিত। জাতিকে এ বিষয়ে জানানো উচিত। পঁচাত্তরের ৩রা নভেম্বর থেকে ৭ই নভেম্বর পর্যন্ত ঘটনাবহুল সময়ে সংগঠিত ইতিহাসও প্রকাশ করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা হয়েও কর্নেল তাহের সরকারের বিরুদ্ধে জাসদ গণবাহিনী গঠন করলেন। জিয়াকে উদ্ধার করলেও পরবর্তীতে জিয়ার সঙ্গে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে তাকে প্রাণ হারাতে হলো। এরপরও তাকে বীরের উপাধি কিভাবে দেয়া হয়?
দীর্ঘ চার দশক আগের হত্যাকাণ্ড। জাসদ ও অন্যদের ভূমিকার বিষয়টি তুলে ধরতে এত দীর্ঘ সময় লাগলো কেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে আওয়ামী লীগের এই নেতা বলেন, কেন এত সময় লাগলো এ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করতে চাই না। তবে, আমি বরাবরই এ নিয়ে সোচ্চার ছিলাম। ইতিহাসের জন্য বইপত্র পড়তে হবে না। আমি নিজেই এই ইতিহাসের সাক্ষী। চোখের সামনে তখনকার অনেক ঘটনাই দেখেছি। এ বিষয়টি নিয়ে জাতীয় সংসদেও আমি কথা বলেছি।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন